টুকের বাজারে সেদিন আসরের আলো ঢলে পড়েছিল তির্যকভাবে।
যেন আকাশ নিজেই হাঁটু মুড়ে বসেছে পাহাড়ের কোলে। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরগুলো দূরে শুয়ে আছে — ক্লান্ত দেবদূতের মতো। ভারতের সেভেন সিস্টার্সের পর্বতমালা দিগন্তে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ডাকছে, যেন বলছে — এদিকে এসো, এখানে গল্প আছে। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে একটি নদী। ঝিরিঝিরি। কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। কার সাথে কথা বলছে, কেউ জানে না। হয়তো নিজের সাথেই।
আমি এসেছিলাম বাইক মেরামত করতে।
আসরের সালাত পড়লাম মসজিদে। সিজদা থেকে উঠতেই মনে হলো, পৃথিবীটা একটু হালকা হয়ে গেছে। কাঁধের ভার নেই। পায়ে ফুরফুরে হাওয়া। বাজারে হাঁটতে লাগলাম উদ্দেশ্যহীনভাবে — যেভাবে মেঘ ভাসে, যেভাবে দোয়া উড়ে যায় আকাশে।
তখনই চোখে পড়ল।
ফুটপাতে সারি সারি রসগোল্লার দোকান। ডেকচিগুলো থেকে মিষ্টি বাষ্প উঠছে। সেই বাষ্পে মিশে আছে কিসের একটা গন্ধ — চিনির নয়, স্মৃতির। শৈশবের। মায়ের রান্নাঘরের। বিক্রেতারা ডাকছেন, "নেন ভাই, তাজা রসগোল্লা।" শব্দগুলো বাতাসে ভেসে যাচ্ছে পাখির পালকের মতো।
এক দোকানের পাশে দাঁড়ালাম। দাম জানতে চাইব।
ঠিক তখনই দেখলাম তাদের।
দুটো ছেলে। ছোট্ট। বয়স হয়তো সাত আর নয়। গায়ে রোদে পোড়া রং, পায়ে চপ্পল নেই, চোখে আকাশের মতো বিশালতা। তারা এসে দোকানির কানের কাছে ঝুঁকল। কী যেন ফিসফিস করল। দোকানি একটু হাসল। পাকা আমের মতো মিষ্টি সে হাসি।
জিজ্ঞেস করলাম, "কী বলল?"
দোকানি বললেন, "পাঁচ টাকায় রসগোল্লা হবে কিনা জিজ্ঞেস করছে।"
বুকের ভেতরে কী একটা নড়ে উঠল। পাঁচ টাকা। দুটো শিশু। একটা স্বপ্ন — এতটুকু ছোট, এতটুকু সত্যি।
বললাম, "দুজনকে দুটো করে দিন।"
টাকা মিটিয়ে দিলাম। তারপর সরে এলাম।
কারণটা সহজ। আমি যদি দাঁড়িয়ে থাকি, ছেলে দুটো লজ্জা পাবে। লজ্জায় হয়তো রসগোল্লা মুখেই দেবে না। শিশুদের আত্মসম্মান বড় কোমল। তা ভাঙতে নেই। তা ভাঙা পাপ।
দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আড়াল থেকে দেখলাম।
ছেলে দুটো রসগোল্লা হাতে নিল। বড়জন ছোটজনকে দিল আগে — সে মমতায় কোনো ভণিতা নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। শুধু ভালোবাসা, সহজ ও নিখাদ। তারপর নিজে নিল। মুখে দিল।
সেই মুহূর্তে — আমি শপথ করে বলতে পারি — আকাশের রং একটু বদলে গেল।
পাহাড়গুলো একটু কাছে এলো।
নদীটা একটু ধীরে বইতে লাগল।
ছেলেটার চোখ বন্ধ হয়ে গেল তৃপ্তিতে। সেই বন্ধ চোখের পাতায় যেন আঁকা আছে জান্নাতের কোনো বাগান। রসগোল্লার রস গড়াল ঠোঁটের কোণ দিয়ে। সে রস মুছল না। মুছবে কেন? এই রস যে অমৃত।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।
আমার বুকের ভেতরে একটা ফুল ফুটল। কী রঙের, বলতে পারব না। হয়তো সেই রঙের নাম এখনো মানুষ দেয়নি। হয়তো সে রং শুধু দেখা যায় — যখন কেউ অন্যের আনন্দের জন্য নিজে সরে দাঁড়ায়।
দুটো শিশু। দুটো রসগোল্লা। পাঁচ টাকার একটু বেশি।
কিন্তু সেই মুহূর্তের দাম? সারা পৃথিবীর কোনো বাজারে তার মূল্য নেই।
সন্ধ্যা নামছিল। আকাশে লাল ছড়িয়ে পড়ছিল পশ্চিমে — যেন কেউ দোয়া করছে, হাত তুলে। পাহাড়ের সিলুয়েট ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। নদী বলছে তার অনন্ত কথা।
আমি বাইক নিয়ে ফিরলাম।
কিন্তু কিছু একটা রেখে এলাম টুকের বাজারে। হয়তো মনের একটু ভার। হয়তো একটু অহংকার। হয়তো এই বিশ্বাস যে — ভালো থাকা মানে বড় কিছু নয়।
দুটো রসগোল্লা। দুটো হাসি। একটা সরে যাওয়া।
এটুকুই যথেষ্ট। আল্লাহর দরবারে, এটুকুই অনেক।
টুকের বাজারে এখনো প্রতিদিন আসরের আলো ঢলে পড়ে। ডেকচিতে রসগোল্লা ফোটে। নদী বয়ে যায়। পাহাড় হাত নাড়ে। আর কোথাও না কোথাও দুটো শিশু ফিসফিস করে স্বপ্নের দাম জানতে চায়।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।